রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০১:৩৯ অপরাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি:
নরসিংদী, রংপুর, খুলনা, বাগেরহাট, দিনাজপুর ও খাগড়াছড়িতে জেলা প্রতিনিধি আবশ্যক। প্রার্থীকে অবশ্যই অধুমপায়ী ও স্নাতক ডিগ্রী পাশ হতে হবে। ই-মেইলে আবেদন করুন। 

ঢাবির ভাস্কর্যের গল্প

লেখক : পাঠান সোহাগ
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১০.৪৮ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬ এর ছয় দফা, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সব জাতীয় আন্দোলনের সূতিকাগার এই বিশ্ববিদ্যালয়। এসব সংগ্রামের গৌরব জানান দিতে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কিছু ভাস্কর্য। প্রতিটি ভাস্কর্যের পেছনে রয়েছে একেকটি সংগ্রামের গল্প। ভাস্কর্যগুলো নিছক জড়বস্তু নয়, বরং ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ। এগুলো মাথা উঁচু করে বলছে অধিকারের কথা, ত্যাগের কথা।

এগুলোর মধ্যে কলাভবনের সামনে ‘অপরাজেয় বাংলা’, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামনে ‘শান্তির পায়রা’, সড়ক দ্বীপের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’, টিএসসি চত্বরে ‘সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য, বেগম রোকেয়া হলের ভেতরে ‘রোকেয়া ভাস্কর্য’, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে ‘মা ও শিশু ভাস্কর্য, মধুর ক্যানটিনের সামনে মধুদার ভাস্কর্য, জগন্নাথ ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের মাঝামাঝি ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ উল্লেখযোগ্য। তবে এসব ভাস্কর্যের ইতিহাস জানেন না অনেক শিক্ষার্থী। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খোদ ইতিহাস বিভাগের অনেক শিক্ষকও এই ভাস্কর্যগুলো সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি। এখানে ঢাবির ভাস্কর্যগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো :

অপরাজেয় বাংলা : বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ লড়াইয়ের ইতিহাস জানিয়ে দেয় এই ভাস্কর্য। সেই ইতিহাসের প্রতীকী চিহ্নই ‘অপরাজেয় বাংলা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনের বেদিতে দাঁড়ানো তিন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিমূর্তি যেন অন্যায় ও বৈষম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠার গান গাইছে। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গৌরবজনক অংশগ্রহণ জানিয়ে দিচ্ছে এই ভাস্কর্য। ১৯৭৩ সালে ‘স্বাধীনতা ভাস্কর্য’ নামে এটির প্রাথমিক কাজ শেষ হয়। পরে লোকমুখে পরিচিতি পায় ‘অপরাজেয় বাংলা’ হিসেবে। বর্তমানে মিছিল-মিটিং সব আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র এটি। ভাস্কর্যটির মডেল ছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে। আর নারীমূর্তির মডেল ছিলেন হাসিনা আহমেদ। স্বাধীনতার এ প্রতীক তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন গুণী শিল্পী ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ।

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা : প্রধানত ষাটের দশকের তরুণ প্রজন্মের লড়াইয়ের পরিণতি হলো মুক্তিযুদ্ধ। দেশের সব পেশার মানুষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ত্যাগের বিনিময়ে এই অর্জনকে স্মরণ রেখেই টিএসটির সড়ক দ্বীপে নির্মিত হয় ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’। এটি নির্মাণ করেন ভাস্কর শামীম শিকদার।

এই ভাস্কর্যের গা-জুড়ে রয়েছে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচাররে কয়েকটি খণ্ডচিত্র। বেদির ওপর মূল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ওপরে বামে আছে মুক্তিযোদ্ধা কৃষক আর ডানে অস্ত্র হাতে দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মাঝখানে অস্ত্র হাতে নারী ও পুরুষ যোদ্ধারা উড়িয়েছে বিজয় নিশান। এ ভাস্কর্য বেদির বাম পাশে আছে ছাত্র-জনতার ওপর অত্যাচারের নির্মম চেহারা। ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ এ ভাস্কর্য গড়া শেষ হয়।

রাজু ভাস্কর্য : বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের নিদর্শন এই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। শ্যামল চৌধুরী ও সহযোগী গোপাল পাল এ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দখলদারিত্বের রাজত্ব কায়েম করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মঈন হোসেন রাজু। তার স্মৃতি রক্ষার্থে এ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়।

স্বাধীনতার সংগ্রাম : জগন্নাথ হলের পশ্চিম পাশে ফুলার রোডের একটি সড়কদ্বীপে স্থাপন করা হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ এই ভাস্কর্য। এই সড়কদ্বীপে রাখা হয়েছে আরো অনেক ভাস্কর্য। এক জায়গায় এত ভাস্কর্য দেশের আর কোথাও নেই। মূল ভাস্কর্যটিতে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ তথা বিজয়ের আনন্দ ঠাঁই পেয়েছে। ভাস্কর্যের সবচেয়ে উঁচুতে বন্দুকের সঙ্গে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা বাঁধা। তার নিচে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের তর্জনীর উঁচু করা সেই চিরচেনা ভঙ্গি। ভাস্কর্যটিতে ৪২টি বাতি, একটি সংকেত বাতি, একটি লাইটিং, একটি পানির পাম্প ও ছয়টি পানির ফোয়ারা সংযুক্ত করা আছে। ভাস্কর্যগুলোর সবই নির্মাণ করেছেন ভাস্কর শামীম সিকদার। মূল ভাস্কর্যটি ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন মনীষীর ছোট ছোট অনেক ভাস্কর্য।

এ ছাড়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে রয়েছে নূর হোসেনের ভাস্কর্য, এটিও নির্মাণ করেছেন শামীম সিকদার। ১৯৯১ সালে ২৭ অক্টোবর তৈরি করা হয়েছিল জয় বাংলা, জয় তারুণ্য। ১৯৯১ সালের ৩০ অক্টোবর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত মিজানুর রহমান মিজানের স্মরণে এই ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়। এ ভাস্কর শিল্পী আলাউদ্দিন বুলবুল, আবদুল মালেক সাজু ও রনি পাল তৈরি করেছেন। এ ছাড়া ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ফুলার রোডে স্বাধীনতা চত্বরে নির্মাণ করা হয়েছে ‘অমর একুশে’। এটিও শিল্পী শামীম শিকদারের প্রয়াস। ২০১১ সালের আগস্টে মানিকগঞ্জে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরের স্মরণে নির্মিত হয় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের ভাস্কর্য। ২৫ মার্চ গণহত্যার একটি ফলক হিসেবে শামসুন নাহার হলের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতি ৭১ অমলিন। আততায়ীর হাতে নিহত ছাত্রলীগ নেতা মনিরুজ্জামান বাদলের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ মনিরুজ্জামান বাদল স্মৃতিফলক। ১৯৯২ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি নিহত হন। মধুর ক্যানটিনের সামনে গড়ে তোলা হয়েছে মধুসূদন দে স্মৃতি ভাস্কর্য। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকবাহিনীর গুলিতে তিনি নিহত হন। এ ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন মো. তৌফিক হোসেন খান।

এ ছাড়াও স্মৃতি চিরন্তন, স্বামী বিবেকানন্দ ভাস্কর্য, সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, শান্তির পায়রা, বেগম রোকেয়া ভাস্কর্য, মা ও শিশু ভাস্কর্য, বৌদ্ধ ভাস্কর্যসহ আরো কিছু ভাস্কর্য রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ভাস্কর্য সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা যা বলেন : বিশ্ববিবদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আবদুল্লাহ জানান, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কয়টি ভাস্কর্য আছে তা তার জানা নেই। ‘জয় বাংলা, জয় তারুণ্য’ ও ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’র অবস্থানও জানাতে পারেননি তিনি। আরেক শিক্ষার্থী মো. বদরুল ইসলাম বলেন, ভাস্কর্যের সঠিক তথ্য শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তারা এগিয়ে এলেই শিক্ষার্থীরা ভাস্কর্যগুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন। ঢাকা কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাসেল সপ্তাহের দুই তিন দিন ডাকসুতে আসেন। তার কাছে ভাস্কর্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘ভাস্কর্যগুলো দেখেছি। তবে নাম ও কী উদ্দেশে স্থাপন করা হয়েছে তা বলতে পারছি না।’ ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ সাদী অপরাজেয় বাংলা কেন তৈরি করা হয়েছে; তা জানেন না। ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ভাস্কর্য কেন স্থাপন করা হয়েছে তার তথ্যও তার জানা নেই। বিজয় ৭১ হলের যমুনা ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থী আবদুল হালিম জানান, ‘শিক্ষার্থীরা সাধারণত ক্লাস ও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যেটুকু না জানলেই নয়, সেটুকুই জানতে চেষ্টা করে। এর বাইরে বেশি কিছু জানার প্রয়োজন মনে করে না। ভাস্কর্যের ইতিহাসও আমার জানা নেই।’ এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আমানউল্লাহ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলে বিভিন্ন পদ্ধতিতে এসব ভাস্কর্য সম্পর্কে তথ্যগুলো শিক্ষার্থীর সামনে তুলে ধরতে পারে।’

ভাস্কর্য সম্পর্কে শিক্ষকরা যা বলেন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেন বলেন, ‘ভাস্কর্যগুলো সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তবে সঠিক তথ্য পেতে হলে আমাদের সহকর্মী আবু মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’ ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে বারবার চেষ্টা করার একপর্যায়ে তিনি মুঠোফোন ধরেন। প্রশ্ন শুনে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে লাইন কেটে দেন। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভাস্কর্যগুলো মোটেও জড়বস্তু নয়। এগুলো ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ। ভাস্কর্যগুলো দেখে শিক্ষার্থী-দর্শনার্থীদের জাতীয় আন্দোলন সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মে। জানার আগ্রহ বাড়লেই হবে না, জানতে হবে সঠিক ইতিহাস। তবেই সার্থক হবে ভাস্কর্য স্থাপনের মূল উদ্দেশ্য।

শেয়ার করুন

এই বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© ২০১৯  শিকড়নিউজ২৪.কম সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত |
Developed by POPCORN
themesbazshikornew23234
© ২০১৯  শিকড়নিউজ২৪.কম সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত |
Theme Download From ThemesBazar.Com